মুভি রিভিউ : পিপড়া বিদ্যা

0

অস্বীকার করবো না, সিনেমা হলে যখনই কোন বাংলা ছবি দেখতে যাই তখনি আমি কিছুটা প্রিডিটারমাইন্ড থাকি। মানে দেশি সিনে জগতের হাল-হকিকতের ব্যাপারগুলো মাথায় রেখে অনেকটা জোর করে সিনেমার মান যেমনই হোক ভাল লাগবে গোত্রের মনোভাব নিয়ে হলে ঢুকি। হালের আশিকুর রহমান, স্বপন আহমেদ বা অনন্য মামুন সবার ক্ষেত্রেই সেটা মোটামুটি প্রযোজ্য। তবে বাংলাদেশের যে দু’তিন জন পরিচালক আছেন যাদের মুভি দেখতে যাই ঠিক উল্টো মনোভাব নিয়ে। মানে তাদের কাছে প্রত্যাশা বেশি। কাজে ধার আছে, কিন্তু কোথায় কি যেন নেই! তাই সবসময়ই মনে হয় হতাশ হবো। আর এই বেশি প্রত্যাশার কারণে হতাশ করা পরিচালকদের মধ্যে মনে হয় প্রথমেই আছেন মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী।

তো এবারের মুভি পিঁপড়াবিদ্যা – হ্যাঁ, Anticipation ও apprehension দু’টোই ছিল। বিশেষত মেইড ইন বাংলাদেশের পর একাধিক গার্বেজ আর টেলিভিশনের মতো could have been interesting স্টোরিলাইনকে ধ্বংস করার পর ফারুকীর কাজ নিয়ে ভয় ছিল। টেলিভিশন নাম দেখে গল্প আঁচ করা গিয়েছিল, পিঁপড়াবিদ্যার না। নাম দেখে ভেবেছিলাম হয়তো থ্রু এ্যান্ড থ্রু স্যুরিয়ালিস্টিক কোন ছবি হবে। যাই হোক নতুন বাংলা ছবি কোন রিভিউ, প্রিভিউ পড়ার আগেই বসুন্ধরায় ফার্স্ট শো দেখার লোভ ঠিক সামলাতে পারেনি।

কোথাও একবার পড়েছিলাম, মুভির প্রথম কনফ্লিক্ট সিক্যুয়েন্স (মানে যেই সিক্যুয়েন্স কোন একটা এক্সপ্ল্যানেশন ডিমান্ড করবে) না-কি প্রথম ১০-১৫ সেকেন্ডেই থাকতে হয়। পিঁপড়াবিদ্যায় মনে হয় আছে ৫ সেকেন্ডের মধ্যে। প্রথমেই দেখা যায় লোকাল বাসে বসে এক লোক কোন এতিম খানায় ১ কোটি টাকা ডোনেটের কথা বলছে। একেবারে আম আদমীও বুঝবে ঘাপলা আছে। নড়চড়ে বসবে। জানতে চাইবে (হলে দেখেছি সবাই আদতেই জানতে চাইছিল) কাহিনী কী? তাহলে কাহিনীটাই আগে বলে নিই।

কাহিনী হচ্ছে, মিঠু শিক্ষিত বেকার। একসময় সিগারেট কোম্পানীর মার্কেটিংয়ে কাজ জোটে। সেখান থেকে এমএলএম ব্যাবসায়। সেকেন্ড হ্যান্ড মোবাইল কিনতে গেলে একলোক মিঠুকে চোরাই মোবাইল বিক্রি করে। মোবাইলটা বিখ্যাত অভিনেত্রী রিমার। মিঠুকে অনুরোধ করলে ফোন ফেরত দিতে রাজি হয় সে। কিন্তু তার আগেই ফোনের ভেতরে থাকা ভিডিও দেখে নেয় সে। আর তারপর থেকেই রিমার কাছে থেকে মিঠুর বিভিন্ন অন্যায় সুযোগ সুবিধা নেয়া শুরু হয়। তবে, সুযোগের কেবল এক পিঠ না, একসময় সে বুঝতে পারে আদতে শুধু রিমার সম্মান ঝুঁকির মুখে না; ঝুঁকির মুখে তার নিজের জীবনও। এখনি সব বলে দিলে, হলে গিয়ে দেখার মজাটাই মাঠে মারা যাবে, তাই গল্পের বর্ণনা এ পর্যন্তই রাখছি।

এখন আসি মুভির আসল বিষয়গুলো নিয়ে। দু প্যারা আগেই বলেছি শুরুটা যাকে বলে ফাঁটাফাঁটি। তবে, ফারুকীর আগের ছবি টেলিভিশনে শুরুটাও অসাধারণ ছিল, আজকে প্রথম থেকেই মাথায় ছিল যে পাঁচ মিনিট দেখেই ‘মুভিটা তো ভালোই বানাইসে’ ধরণের কোন সিদ্ধান্ত নেব না। সেকেন্ড সিক্যুয়েন্সে ডিরেক্টর চলে যায় মিঠুর ব্যাকগ্রাউন্ডে। সময়ের ব্যাপারটা মাথায় রেখেছিলেন ফারুকী তাই অযথা ডিটেইলিংয়ে যাননি। মায়ের মুখে যাস্ট মিঠু যে শিক্ষিত এবং সে যে কোন কাজে যেতে রাজি না, সেরকমের কিছু কথা। মায়ের স্বাভাবিক রেগে ঝাড়ি দেয়া সিক্যুয়েন্স। মানে ১ মিনিটেরও সিক্যুয়েন্স না কিন্তু দর্শক যেন গল্প স্কিপের অভিযোগ তুলতে না পারে। এরপর এমএলএম কোম্পানিতে আসার কিছু সিক্যুয়েন্স দিয়ে পরিচালক ঢুকে যান মূল গল্পে। যাকে বলে নীট বিগিনিং। সময় নষ্টও করেননি। আবার আগা নেই মাথা নেই হঠাৎ করেই কোন কিছু শুরুও করে দেননি।

গল্পটা ফারুকীর নিজের লেখা। ছবির গল্প ও চিত্রনাট্য কেমন হওয়া উচিৎ এ নিয়ে ভারতীয় এক অভিনেতা, পরিচালক ও লেখক বলেছিলেন (নামটা এ মূহূর্তে মনে নেই), ‘I film can be good even if it is poorly acted or directed, but it can never be good if it is poorly written’. ফারুকী প্রথম দাঁওটা মেরেছেন এখানেই। নিজের লেখা গল্প হওয়ায় পরিচালক হিসেবে ইমোশনগুলো ধরতে পেরেছেন। কমিক পাঞ্চগুলো ভাড়ামো না, বরং সত্যিকারেই প্রাণখুলে হাসার মতো মনে হয়েছে। আর সবচে’ ভালো লাগলো এই যে গল্পের পাতাকে মোটা বানানোর জন্য বাংলাদেশের অধিকাংশ লেখক-পরিচালকের মতো বাড়তি মেদ যোগ করেননি তিনি।

স্করসিসে মুভির গল্প নিয়ে একবার বলেছিলেন যে, আদতে বলার মতোন নতুন কোন গল্প নেই। তবে নতুন করে বা নতুন ভাবে বলার মতো আবার গল্পের অভাব নেই। ফারুকী কোন নতুন গল্প আমাদের বলেননি। হয়তো আমাদের দেশের কনটেক্সটে সিনেমায় নতুন গল্প। কিন্তু বিভিন্ন অভিনেত্রীদের এরকম গল্প পত্রিকায় হরহামেশাই পড়া যায়। ফারুকী সেই একই গল্প বলেছেন শুধু ভিন্ন ভাবে। আর থ্যাংকস গড, তিনি শেষ পর্যন্ত শিক্ষক হতে চাননি। বিবাহ পূর্ববর্তী নাজায়েজ সম্পর্ক টাইপের থার্ডক্লাস ওসিয়তও তিনি দেননি।

ভাই ব্রাদার গ্রুপের ডায়ালগকে সবসময় নিন্দা করা হলেও, এই মুভিতে মোস্তফা সরোয়ার ১০০ তে ১০০ নম্বর পেয়েছেন। ডায়ালগে যখন গালাগালি এসেছে তখন গল্পের প্রয়োজনেই এসেছে, চরিত্রগুলোর মানসিক অবস্থা বোঝাতেই এসেছে। অনেক মুভির মতো পিঁপড়াবিদ্যাতেও গল্প এগুবার সাথে সাথে একটা ডার্ক শ্যাডো এসে ভর করে। এবং এ্যাটলিস্ট আমার কাছে সেটা উপভোগ্য ছিল।

মেকিং ও গল্পের দিক থেকে দু’একটা ছোট-খাট লুপহোল ছিল। যেমন, মিঠু রিমার মোবাইল থেকে তার এইচটিসি মোবাইলে ছবিগুলো কপি করে রেখেছিল বলে সে জানায়। কিন্তু যখন তার হাতে রিমার মোবাইল ছিল তখনো সে নতুন মোবাইল কেনেনি। আবার মিঠু ঘর থেকে পালিয়ে যে দোকানে আশ্রয় নেয়, সেই দোকানদারের সাথে তার সম্পর্ক বা কোন কিছুই ক্লিয়ার ছিল না। কিন্তু বোঝা যাচ্ছিল কোন এক কারণে দোকানদার তার ওপর ভয়ানক খ্যাপা। কালার গ্রেডিংয়ে মনে হচ্ছিল কিছু ১৯-২০ হয়েছে। তবে সবমিলে অন্যান্য বাংলা ছবির তুলনায় ক্যামেরা ও সিনেম্যাটোগ্রাফি দু’টোই ছিল অসাধারণ। শুধু রিমাকে গিয়ে যখন মিঠু স্বামী-স্ত্রীর অভিনয়ের প্রস্তাব দেয় তখন পেছনের জানালাটার কালার দেখে মনে হচ্ছিল ড্রিম সিক্যুয়েন্স।

এবার আসি অভিনয়ের ক্ষেত্রে। এক কথায় মিঠু স্টোল দ্যা শো। কমেডির এরকম সাটেল এক্সপ্রেশন আমি বাংলাদেশি কোন অভিনেতার মধ্যে এখনো দেখেনি। গল্পের শুরুতে তাকে পোর্ট্রে করা হয়, চুপচাপ একটু বোকাসোকা হিসেবে। কিন্তু সেই চরিত্রটাই দিয়ে মিঠু কখনো উইটি কখনো আবার প্রায় সাইকোটিক। সত্যি ওর অভিনয় দেখে মনে হয়েছে যদি কোন এ্যাকটিং স্টাইলে আঁটকে না যায়, তবে বাংলাদেশ আসলেই একজন গ্রেইট এ্যাকটর পেল। রীমা চরিত্রে ভারতীয় শীনা চৌহানকে বলবো না খুব বেশি ভালো লেগেছে। কিন্তু এটাও সত্যি অনেক ভেবেই এই চরিত্রে শীনাকে রিপ্লেস করার মতো কাউকে পেলাম না। শীনার চরিত্রের সবচে’ ভালো দিক ছিল আবেগের পরিমিতিবোধ। অয়ন ক্যারেক্টারে লিখনকে আসলেই হাইক্লাস ভদ্রছেলে কিন্তু প্রেমের ব্যাপারে এ্যাডভেঞ্চারাস সেরকমই লেগেছে। মানে অয়ন চরিত্র অসাধারণ ভাবেই উৎরে এছে। অন্যান্য চরিত্রগুলো ভালো ছিল। মিঠুর প্রাক্তন প্রেমিকা সাথীর হাজব্যান্ড ক্যারেক্টারটা খুবই ইন্টারেস্টিং ছিল। কিন্তু ভদ্রলোকের অভিনয় ততটা দাঁগ কাটেনি।

এ্যাবসট্রাক্ট এন্ডিং, দর্শকদের জন্য মিঠুর আসল অবস্থানটা কি তা নিয়ে বিতর্ক করার সুযোগ, তবু পিঁপড়াবিদ্যা আমার দেখা ফারুকীর এখন পর্যন্ত by miles সেরা কাজ। ছবি এন্টারটেইনিং করার জন্য যে শুধু আইটেম নাম্বারের দরকার নেই, সেটা মনে হয় নবীন অনেক পরিচালককে ভালো ভাবেই দেখালেন তিনি। একবার রাশান এক পরিচালাকের ওয়ার্কশপে শুনেছিলাম যে, প্রতিটা মুভিতে পরিচালকের একটা সিগনেচার থাকতে হয়। মুভির শুরুতে আর শেষে ঘরের মানুষেদের কথাবার্তার কিছু বিশেষ সিনে কাট না করে ট্রলি করে একরুম থেকে আরেক রুমে যাওয়া সম্ভবত ফারুকীর সেই সিগনেচারেরই প্রয়াস। আর সেটা হলে বলবো অবশ্যই ব্যাপারটি ইনোভেটিভ।

গেল কয়েক বছরের উল্লেখযোগ্য বাংলাদেশি মুভির কথা বলতে হলে অবশ্যই গেরিলার পরেই আসবে পিঁপড়াবিদ্যা। এবাদেও আছে আরেকটু বাণিজ্যিক ঘরাণার চোরাবালি আর অনেক বেশি স্যুরিয়ালিস্ট মুভি অমিত আসরাফের ‘উধাও’। একদিকে এরপর কি হবে আগ্রহ আর অন্যদিকে জীবন নিয়ে অনেক বেশি সত্যি কিছু কথা- সবমিলে পিঁপড়াবিদ্যা আমার কাছে ১০-এ সাড়ে ৮ পাবার মতো একটি মুভি।

অনেক বড় রিভিউ তারপরো শেষ সিনে আসলে মিঠু কি সুস্থ্য না… সেটা জানাবেন কিন্তু। আমার মতে পুরোটাই ভড়ং। আমার তো ভালো লেগেছে আশা করি আপনাদেরও লাগবে। মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীকে শুভেচ্ছা এরকম কিছু বানানোর জন্য। আশা করি তিনি আবারো বানাবেন। সত্যি বলতে, আমি খুবই চাইছি পিঁপড়াবিদ্যার সিক্যুয়েল না, কিন্তু মিঠু চরিত্রটিকে তিনি আবার তার কোন সিনেমায় ফিরিয়ে আনুক। দর্শকরা এটা ডিজার্ভ করে।

প্রথম প্রকাশ অক্টোবর ২৫, ২০১৪ – ইস্টিশন ব্লগ

0%
0%
Awesome
  • User Ratings (0 Votes)
    0
Share.

About Author

অর্ণব গোস্বামী। বাংলাদেশী ব্লগার এবং প্রাক্তন সাংবাদিক। অনলাইনে লেখালেখির বয়স বছর আটেক। ইচ্ছা ছিলো, সমাজটাকে বদলে দেবার। মৌলবাদী গোষ্ঠীর রক্তচক্ষু, হুমকি-ধামকি আর সময়ে সময়ে আক্রমন দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে কিন্তু উদ্দেশ্য থেকে টলাতে পারেনি। এখনো স্বপ্ন দেখি, বর্তমান বাংলাস্তান আবারো একদিন পরিণত হবে সোনার বাংলায়।

Leave A Reply

© Copyright 2017 | crafted by codesmite