লাভ এ্যাট ফার্স্ট সাইট

0

তখনো বয়সটা বেশ কম ছিল। মানে ভেতো বাঙালি ঘরের সন্তানদের জন্যে যখন প্রেম হচ্ছে শুধু নাটকের মধ্যে সীমাবদ্ধ একটি শব্দ। সামনে কেউ এ নিয়ে কথা বললে লজ্জার বিষয় আর গল্প উপন্যাসে ‘প্রেম’ বিষয়টির উপস্থিতি মানে পরিবারের কাছে পর্ণোগ্রাফির শামিল। আমার লাভ এ্যাট ফার্স্ট সাইট নামক জ্যাঠামীর শুরুটা অনেকটা এমনি সময়ে।

ক্লাস থ্রি কি ফোরে পড়ি! এখন যতই কেতাবী জারগন ব্যবহার করি না কেনো, তখন আমার ইংরেজির গণ্ডি ছিল, মুখের সামনে নোটবুক ধরে যথাসম্ভব কাগজ উড়িয়ে উচ্চারণ পর্যন্ত। আমাদের ইংরেজি শিক্ষক মতে, ‘ঠু’ বলতে গ্যালে মুখের সামনে যত কাগজ উড়বে, আমাদের উচ্চারণ ততো পোক্ত হবে।

যাই হোক, হ্যা, আমার নন-ফিকশনাল আলোচনার বিষয় বিদিশি ভাষা না। তবে কথা প্রসঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক ভাবে চলে আসার একটি কারণ অবশ্যই আছে। পরবর্তীতে যখন বড় হয়েছি, কিছুটা বুড়ো-ও হয়েছি, তখন থেকে ফিল্মের সবচে’ বিরক্তিকর লাভ এ্যাঙ্গেল আমার মনে হতো, এই প্রথম দর্শনে প্রেমকে। মাঝে মাঝে মনে হতো, আসলে আমি নিজেই ফিল্মের নায়ক। কারণ সিনেমার নায়কের মতো আমিও সম্পূর্ণ নিজের চরিত্রের বাইরে গিয়েই প্রথম দর্শনেই কারোর গভীর প্রেমে ডুবে গিয়েছিলাম।

Picture taken from www.bgr.in

ফেব্রুয়ারি ১৪, ১৯৯৬; তখনো ভ্যালেনটাইন্স দেশে অতো জনপ্রিয় হয়নি। ১০ বছরের আমার কাছে রীতিমতো নাম না জানা যে কোন একটি দিন। শুরুটা যে কোন গল্পের মতোই। মাথা ব্যাথা, ক্লাসে যায় নি। (মানে কোন না কোন একটা উপায়ে নায়ক-নায়িকার পরিচিত হওয়া লাগবে। আমার ক্ষেত্রে যদিও পরিচয়টা একপাক্ষিক।) কিছু না চিন্তা করেই মায়ের কাছে পার্মিশন চেয়েছিলাম টিভি দেখার। প্রতিদিন পার্মিশন পেতাম না। সেদিন পেয়েছিলাম। আর তারপরেই হঠাৎ জীবন যেন বদলে গেল।

www.sociallover.net

আমার ছোট্ট জীবনে অদ্ভুত দু’টা ভালোবাসার জন্ম দিয়েছিল ৯৬-এর বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। সেদিন প্রথম দর্শনেই ১ নয় একসাথে প্রেমে পড়ে যাই আকাশী পোশাক পড়া ১১জনের। ২৪ গজের পিচের সাথে যে চলতি ভালোবাসা রয়েছে তার শুরুটা ছিল নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট টিম দিয়ে। মাই লাভ এ্যাট ফার্স্ট সাইট।

www.crickettrolls.com

টিম নিউজিল্যান্ডের প্রতি আমার প্রেমকে, যদি কোন মার্কিনিকে ব্যাখ্যা করতে দিতাম, তবে হয়তো সে গ্রাফ করে আমার মানসিক অবস্থা বলে দিতো। মাঝে মাঝে নিজেই ভাবি কেনো নিউজিল্যান্ড! বাংলাদেশ তখনো ক্রিকেটে আসেনি তাই স্কুলে শুনছি মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই বলে প্রথম সমর্থন হবে পাকিস্তান। পারিবারিক ভাবে আবার সবাই ভারতের ভক্ত। কারণটা সেই একই – ধর্মীয়। তাহলে আমি কেন খাপছাড়া।

www.espncricinfo.com

প্রথম বার না বুঝেই কাউকে সমর্থন করলে, সে-টা যে ধরে রাখতে হবে এমনো তো কোনো কথা নেই। বুঝলাম কিছু না বুঝে খেলা দেখছি, হয়তো দুধের দেশ নিউজিল্যান্ডের দুধ খেতাম বলে কিছুটা মাতৃভক্তিও ছিল তাদের প্রতি, কিন্তু তা-তে আজীবন ডাইহার্ট ফ্যান হবার তো কিছু নেই।

বন্ধুরা বুঝিয়েছে ভারত-পাকিস্তানের সুশীতল ছায়ার নিচে আসতে। অনেকে আবার ভেবেছে কারো সাথে ঝগড়ায় যেতে চাই না, তাই এমন দলের নাম বলি, যাদের প্রতি কারো বিদ্বেষ নেই। দ্বীতিয় কথাটা মিথ্যে নয়, ক্রিকেট যে ভদ্র লোকের খেলা সে-টা সবচে’ বেশি প্রমান করেছে নিউজিল্যান্ড। ৫০ লাখের নিচে লোকসংখ্যা। কোন স্টার ক্রিকেটারও নেই। তারপরেও, শুধু টিম স্পিরিট দিয়ে মাঝারি গোছের একগাঁদা অলরাউন্ডারকে নিয়ে প্রায় প্রতি বিশ্বকাপেই যাচ্ছে সেমি ফাইনালে।

www.dailymail.co.uk

আমার নিউজিল্যান্ড প্রেম নিয়ে লেখা দেখলে হয়তো অনেকে ভাববেন আমি কিউই রাজাকার। এমনকি আমি নিজেই একসময় ভাবতাম বাংলাদেশের সাথে নিউজিল্যান্ডের খেলা হলে কাকে সাপোর্ট করবো জানি না। আমার এই কনফিউশনের উত্তর পেয়েছিলাম ১৭ই মে ১৯৯৯-এ। সেদিন জিওফ এ্যালট ম্যাচের প্রথম বল করার পরেই বুঝতে পেরেছিলাম, পরিবারের আর প্রেমের মধ্যে দ্বন্দ্ব হলে, আমি শতভাগ পরিবারের পক্ষেই থাকবো।

কিছুদিন আগে নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট টিমের এক ফ্যান গ্রুপে বলেছিলাম, ‘Cheering for you for last 17 years, still waiting to celebrate for you’ আমার কথা কিছুটা হলেও কাজে লেগেছে যখন কোরি জে এ্যান্ডারসন দ্রুততম সেঞ্চুরি হাকালো। তার ব্যাক্তিগত সাফল্যে খুশি। তারচে’ও ভাল লাগছে এই ভেবে যে, এরকম মারকুটে ব্যাটসম্যানরাও অসহায় ছিল টাইগারদের বিপক্ষে।

স্বপ্ন দেখি একদিন বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলছে বাংলাদেশ আর নিউজিল্যান্ড। আর ম্যাচ শেষে আমি সেলিব্রেট করছি। কিসের সেলিব্রেশন?

এখনের ৭-০ থেকে বেড়ে অন্য কোন সংখ্যা বনাম শূণ্য স্কোরের।

প্রথম প্রকাশ এপ্রিল ১, ২০১৪ – ইস্টিশন ব্লগ

[I DO NOT hold copyright for any of the pictures used in this article. The article has not been written for any financial purpose. No copyright infringement intended. Copyright for the featured image goes to www.dailymaverick.co.za]

0%
0%
Awesome
  • User Ratings (1 Votes)
    4.2
Share.

About Author

অর্ণব গোস্বামী। বাংলাদেশী ব্লগার এবং প্রাক্তন সাংবাদিক। অনলাইনে লেখালেখির বয়স বছর আটেক। ইচ্ছা ছিলো, সমাজটাকে বদলে দেবার। মৌলবাদী গোষ্ঠীর রক্তচক্ষু, হুমকি-ধামকি আর সময়ে সময়ে আক্রমন দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে কিন্তু উদ্দেশ্য থেকে টলাতে পারেনি। এখনো স্বপ্ন দেখি, বর্তমান বাংলাস্তান আবারো একদিন পরিণত হবে সোনার বাংলায়।

Leave A Reply

© Copyright 2017 | crafted by codesmite