বিড়ালের থলে

0

কোন এক হলিউডী মুভিতে শুনেছিলাম, মানুষ না-কি দু’প্রকার – কুকুরপ্রেমী আর বেড়াল প্রেমী। ইয়াংকিদের মতোন নুন আনতে পান্তা ফুরোনো বাঙালিদের অবশ্য বেড়াল-কুকুরের প্রতি আদিখ্যেতা নেই। তারা রাস্তাঘাটে ছোট্ট কুকুর ছানা দেখলে গালে হাত দিয়ে উচ্ছাস প্রকাশ করার মানে খুঁজে পায় না। সত্যি বলবো? ব্যাক্তিগত ভাবে আমি নিজেও পাই না।

গালাগালিতে দারুণ ভাবে ব্যবহার থাকলেও বাংলা সাহিত্য বা প্রবচনে বেড়ালের তুলনায় কুকুরের অবস্থান প্রায় নেই বললেই চলে। বেড়াল তপস্বী, কালো বেড়াল, বাঘের মাসি বেড়াল, থলের বেড়াল। এক কথায় বেড়ালের জয়জয়কার। অন্যদিকে কুকুরের স্বার্থকতা শুধু তাঁর সন্তানের মাধ্যমেই। এবাদে ‘পজেটিভ-নেগেটিভ’ যাই হোক, সর্বত্র ছোট-খাট মিউ মিউ-ই upper-hand পেয়ে থাকে।

কি যাচ্ছেতাই লেখা! নির্ঘাৎ বেড়াল ফেটিশ! ব্যাপারটা ভিন্ন। প্রবচন পড়ি, দেশ গড়ি – দেখি সামনে কি হয়!

‘থলের বেড়াল’। ছোট্ট শব্দ, অদ্ভুত অর্থ। গোপণ কিছু প্রকাশ পাওয়া। আর তার সবচে’ বেশি ব্যাবহারকারী – বঙ্গদেশি রাজনীতিবীদ। ৪৮ ঘন্টা হোক, ২৮ এপ্রিল হোক আরেকদল ‘একদল’কে শুধু থলের বেড়াল বেড়িয়ে যাওয়ার কিচ্ছাই শোনায়। ‘একদল’ও নড়ে চড়ে ওঠে। কালো বেড়ালের পক্ষে সাফাই গায়। হাতের ইসারা ওঠে। কি-বোর্ডের পেছনে থাকে হলুদ বেড়াল। সব হয় চুপ-চাপ, সুন-সান। মাঝে মাঝে আবার ফুঁস করে গলা বাড়ায় হাজার হাজার হাট-বাজারে ছড়িয়ে থাকা বেড়াল তপস্বীরা।

আরেকদলের অভিযোগ-অনুযোগ। থোড়াই কেয়ার ‘একদলের’। পাছে লোকের কিছু বলার ভয় নেই – বড়জোড় বিরক্তি আছে। আর বেড়ালও আরামপ্রিয়। এমনিতেই সবার সামনে দাঁড়িয়েছে, কি দরকার আরো কষ্ট করে বলার যে, ‘আমিই বেড়াল’।

সমস্যা তাদের নিয়ে নয়। কুকুরদের নিয়ে। ‘প্রভুভক্ত’। ইদানিং সেই প্রভু নামটা বোধহয় জ্ঞান-মানবতা। অবাকের কিছু নেই। মানবতা আমাদের দেশজ সংজ্ঞার মানবদের কপিরাইট নয়। সংজ্ঞাগত কুকুরদেরও তা আছে। তাঁরা একরোখা; শেষ দেখে নিতে চায়। মুখের দাঁতগুলো বড্ড সেকেলে, তাই ভরসা মনের দাঁত-জ্ঞানের দাঁত।

বেড়ালের সাথে কুকুরের আজন্ম শত্রুতা। কুকুরের Literal meaning এ নখও আছে, দাঁতও আছে। কিন্তু এখন আর ব্যাবহার নেই। কেজো নখ-দাঁতের পুরোটাই ফিলোজফিক্যাল। আর সবচে’ বড় সুবিধা হচ্ছে কারো নজর-ও নেই। এর চে’ বড় সুযোগ ১৪০০ বছর আগেও বোধ হয় কেউ পায়নি। Activism in alternate media in some sense is way too main stream. তাই বেড়ালের সিদ্ধান্ত সোশ্যাল মিডিয়ার কান ধরে একচ্যুয়াল মিডিয়ায় খবর হিসেবে নিয়ে আসা।

গরমা-গরম খবর! অপরাধ কণ্ঠের ‘ভাইয়ের নির্দেশে পোটলায় বাবা’ পুরাই ফেইল! ‘আমার দেশ’ (আদৌ কি!) উচ্চকণ্ঠে জানান দেয়, ঘেউ ঘেউ করার অপরাধে জেনাকারী কুকুরকে মাঘ মাসেই ভাদ্রের শাস্তি দিয়েছে বেড়াল! বাঘ মামা হুংকার দিয়ে ওঠে। বলে, কুকুরই আমাদের জাতীয় বীর। মহান শহীদ।

শত হলেও বাঘের মাসি বেড়াল। তাই মহান শহীদ বলার পর পরেই থুক্কু কাঁটে। ঝটকায় তাঁকায় নিচে। থলের দিকে। হায় হায় থলেতে তো কিছু নেই – শূণ্য – গড়ের মাঠ। কানে কানে কেউ বলে, নিচের থলে ফাঁকা থাকলেও পাশেরটায় ঠিক মাল আছে। আহ! স্বস্তির নিশ্বাস। তপস্বীরা জেগে উঠছে; তবে বেড়াল এখনো well packed.

চোর না শুনে ধর্মের কাহিনী আর বাঘ না ভুলে রক্তের স্বাদ। এখানে উল্টো। বেড়াল ভোলেনি রক্তের স্বাদ আর কুকুর ভোলেনি ধর্মের কাহিনীতে। ‘রক্ত যখন নিয়েছি, রক্ত আরো নেবো, দেশকে আবারো ‘মুল্ক্’ বলে ছাড়বো, ইনশাল্লাহ!’ সিংহ ফিল্ডে নেই; বনের রাজা বাঘ। এমনিতেও বেড়ালরা ‘রাজার’ ভক্ত না। বি্ল্লি সংসারে তাই প্রতিদিনই নতুন সদস্য আসছে। বাঘ মামা জানে, সিংহের প্রেয়সী আর বেড়ালের ভালোবাসা একই ঝিনুকে বন্দী। কখন কি হয়! থমকে দাঁড়ায়। মধুসূদন বোধহয় কপোতাক্ষ নদের প্রশংসা করেছিলেন, কারণ তিনি মসনদের জৌলুশ বোঝেননি।

থলে থেকে উঁকি দিতে থাকে বেড়াল। বাহ! কিউট তো! বেশ অনুভূতি! কিছু বললেই আচড়ে দেবে। হাত থেকে চামড়া? উহু, শেকড় থেকে গাছ। অবশ্য উপায়-ও বা কি, কুকুরগুলো ইদানিং যা চেচানোর চেচাচ্ছে! এদিক থেকে বাঘ মামা অবশ্য rational. অপরাধ করলে শাস্তি হবে। আরো চিৎকার কর্ বাবা, ডাইরেক্ট শ্রী ঘর। No bail for বেইললেস পোলাপাইন। তবে, তারা বিল্লি পার্টিকে কিন্তু আদরে দিল্লি পাঠাবে না। অপরাধ করার সন্দেহে আঁটক, প্রমান পেলে গ্রেফতার এমনকি সর্ব্বোচ্চ শান্তি পর্যন্ত দিতে পারে।

যদিও পুরোটাই আরেকদল উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা, তারপরো একদলীয় বাঘ মামারা, জয়ন্টে জয়েন্টে পয়েন্টে পয়েন্টে ইনটেলিজেন্স বসায়। কেবল একটু বিশৃঙ্ক্ষল হয়ে একদিন শৃঙ্ক্ষলা রক্ষী বাহিনীর পয়েন্টে আঁচড়ে দেয় বেড়াল। বখাটের দুষ্টুমি আর কি! এ বাদে ১৫ নভেম্বর, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ৩০ মার্চ, ১২ মে, ৭ আগস্ট আর ৩১ অক্টোবরের কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা। বাদবাকি ইউনাইটেড স্টেটস থেকে ইসলামিক স্টেট, সকলের জন্য নিরাপত্তা এ্যাট ইটস বেস্ট।

দেশের শান্তি কে না চায়! সাধারণ মানুষ সব বোঝে। বেড়ালের দোষ আছে। কিন্তু ভাই অনুভূতিতে আঘাত লাগলে আপনি-আমি যে কেউ এমন করবো। একদিন কে যেনো, মিয়া খলিফাকে ফালতু বলছিলো। সাথে সাথে মনে হলো, ব্রাশ ফায়ার করি। Just like that.

অর্থনীতির Hierarchy of Need তত্ত্বটি আমরা মোটামুটি সবাই জানি। বিজ্ঞানী মাসলো। বেড়ালদের অনুভূতিও সেই তত্ত্ব মোতাবেকই চলে। প্রথমে ছিলো কুকুর, তারপর বিরোধী আর আজ ‘জগেশ্বরের’ মৃত্যু সেই কাতারে যোগ করলো কাফেরদের নাম। আগেও ছিলো। তবে, সবার সামনে লুকিয়ে কিছু ‘দুষ্কৃতকারীর’ দুষ্টুমি। আর এবার হলো সরাসরি।

থাকবো না-কো বদ্ধ ঘরে দেখবো এবার জগৎটাকে। বেড়াল আর থলেতে নেই। জগৎকে দেখার জন্য না বরং নিজেকে দেখানোর ওপেন চ্যালেঞ্জ নিয়েই বাইরে নেমেছে। চৌকো কাগজের আনুগত্যে বরং তার থলেতে চুপচাপ ওম নিচ্ছে বাঘ মামা। মাঝে মাঝে ভয় হয়। কোনদিন হয়তো থলেতেই হারিয়ে যাবে। খুঁজেই পাবে না কেউ।

0%
0%
Awesome
  • User Ratings (0 Votes)
    0
Share.

About Author

অর্ণব গোস্বামী। বাংলাদেশী ব্লগার এবং প্রাক্তন সাংবাদিক। অনলাইনে লেখালেখির বয়স বছর আটেক। ইচ্ছা ছিলো, সমাজটাকে বদলে দেবার। মৌলবাদী গোষ্ঠীর রক্তচক্ষু, হুমকি-ধামকি আর সময়ে সময়ে আক্রমন দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে কিন্তু উদ্দেশ্য থেকে টলাতে পারেনি। এখনো স্বপ্ন দেখি, বর্তমান বাংলাস্তান আবারো একদিন পরিণত হবে সোনার বাংলায়।

Leave A Reply

© Copyright 2017 | crafted by codesmite