জার্মানীর রংধনু বসন্ত, বার্লিনের উদারনীতির মসজিদ ও একটি পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন স্বপ্ন

0
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে প্রায় ৭২ বছর হতে চললো। ভয়াবহ ঐ যুদ্ধের কথা উঠলেই মুখে আসে হিটলার আর জার্মানীর নাম। স্বাজাত্য বোধের অজুহাতে সেসময় জার্মান সৈন্যরা খুন করে প্রায় ৬০ লাখ নিরপরাধ ইহুদীকে। পাপের পাহাড়ে, একসময় পতন ঘটে হিটলার বাহিনীর, শেষ হয় যুদ্ধ।

মানবতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ সেদিন থেমেছিলো, কিন্তু মানবতার জন্যে যে লড়াই তার তো শুরু মাত্র। অন্তত জার্মানীর জন্য তো অবশ্যই। গোটা বিশ্ব যেখানে, পূর্বপুরুষদের অপরাধ একটা রাখঢাকের বেড়াজালে আঁটকে রাখে, সেখানে ইউরোপের এ দেশটি বরং ভুল স্বীকার করে মানবতা আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সর্ব্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পুরোদম শক্তিতে মেতে ওঠে। 

বিভিন্ন দিক থেকে শান্তি, সুরক্ষা আর মানবাধিকারে জার্মানী পৃথিবীতে রোল মডেল হয়ে ওঠে। তকমা লাগে লিডার অফ দি ফ্রি ওয়ার্ল্ডের। তাঁদের মানবতার সাথে কোন কিছুতেই গণ্ডগোল বাঁধে না ধর্মের, যা সবসময়ই দেশটির মূল সূর। সকল দিক থেকে এগিয়ে গেলেও, হয়তো শুধু ধর্মের কারণেই সমপ্রেমী/সমকামীদের জন্য কোন কার্যকর আইন হয়নি দেশটিতে। যদিও ২০০১ সাল থেকেই নিজ পার্টনার নিয়ে স্বাধীন ভাবে থাকার অধিকার ছিলো ডয়েচ এলজিবিটিকিউ কমিউনিটির।

বসন্ত শেষ হয়েছে মাস ক’য়েক। জার্মানীতে এখন গ্রীষ্মের খরতাপ। গ্রীষ্মের এমন দিনেই সেখানে লাগলো রংধনু বসন্ত। গতকাল দেশটির সংসদ সমপ্রেমীদের অধিকার দিলো পছন্দের মানুষটিকে বিয়ে করার। সাথে সাথে তাঁরা পেল বিয়ে সম্পর্কিত অন্যান্য অধিকার যেমন দত্তক বা উত্তরাধিকারের স্বাধীনতা।

খোদ জার্মান প্রধানমন্ত্রী (চ্যান্সেলর) এ্যাঞ্জেলা মার্কেল সমকামীতার বিরুদ্ধে ভোট দেন। কিন্তু দিনশেষে সরকার প্রধানের সিদ্ধান্ত নয়, ভোটের ফলাফল আসে গণমানুষের কণ্ঠস্বরের জোড়ে। জার্মান তো বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা সৌদি নয়, যেখানে চলে বর্বর রাজতন্ত্র বা গণতন্ত্রের লেবাশে রাজা রাণীর খেল।

এতক্ষন তো বললাম উন্নত একটি দেশের আইনপ্রণেতাদের কথা। খোদ জার্মানীতেই পুরো বিশ্বে মানবতা এবং সুশিক্ষা ও স্বশিক্ষায় পিছিয়ে থাকা একটি জনগোষ্ঠীও কিন্তু ঠিকই শুরু করেছে নিজেদের সমাজ নতুন করে নির্মানের কাজ। চিন্তা করুন, একটি ধর্মীয় উপসনালয়। জড়ো হয়েছে ভক্তরা। একসাথে প্রার্থনা করছে। ‘তুলনামূলক’ মানবিক ধর্মগুলোতে নারী-পুরুষের একত্রে প্রার্থনা সমস্যা না হলেও, শুধু একবার ভাবুন একজন নারী বা পুরুষের পাশে সসম্মানে দাঁড়াচ্ছে তৃতীয় লিঙ্গ বা সমকামী বা উভকামী একজন।

ডয়েচল্যান্ডের আইন প্রণেতাদের আগেই এমন আধুনিকতার পরিচয় রেখেছে একজন ধর্মপ্রচারক। আর সেটা কোন ধর্মের? হ্যাঁ ইসলাম। সাধারণত আমরা ইসলামকে যে ভাবে দেখি, তা প্রায় পুরোটা পাল্টে দিলেন তুরষ্কে জন্ম নেওয়া আইনজীবী সেইরান আতেস। খুললেন এমন এক মসজিদ যেখানে স্রষ্টার সান্নিধ্য পাবার জন্য বাধ্যবাধকতা নেই নির্দিষ্ট লিঙ্গ বা যৌণতার। বাধ্যবাধকতা নেই সম্মানের নামে হিজাব নামক কারাগারের।

অবাক হতেই হয়। স্বাভাবিক ভাবে সুশিক্ষা এবং স্বশিক্ষা দু’টোতেই পেছানো ইসলাম। আধুনিকতার সাথে পাল্লা দিয়ে অন্য ধর্মগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কার হলেও ইসলাম এখনো আঁটকে আছে ১৪০০ বছর পুরোনো অন্ধকারে। এমনকি কাদিয়ানীদের মতো সংস্কারপন্থী মুসলমানদের এক ঘরে করে রেখেছে কিছু উগ্রবাদী সুন্নী গোষ্ঠী। পাকিস্তানে কাদিয়ানীদের অমুসলিম হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশেও মোল্লারা যখন তাঁদের মসজিদের সাইনবোর্ড নামিয়ে দেয়, তখন সরকার থেকে পাঠানো পুলিশ বাহিনী দাঁড়িয়ে ছিলো ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে।

প্রাচীন কাল থেকে হিন্দু ধর্ম বর্ণবাদের জন্য নিন্দিত হলেও, সমসাময়িক ইসলাম হয়তো ছাড়িয়ে গেছে সবকিছু। মুসলমানদের তীর্থ ক্ষেত্র যে সৌদি আরব স্বয়ং সেখানকার যুবরাজ সালমান ২০১৭ সালেও শিয়াদের ধ্বংসের আহবান জানিয়েছেন, শিয়া সরকারের কারনে আক্রমন করেছেন ইয়েমেন। যেখানে বিশ্বের অন্যতম বড় জঙ্গীবাদী সংগঠন আইসিস উগ্রবাদী সুন্নী, সেখানে তিনি পৃথিবী জুড়ে জঙ্গীবাদের জন্য দায়ী করেছেন শিয়াদের।

এমন পিছিয়ে যাওয়া একটি গোষ্ঠীর সংস্কারের জন্যে কাজ করা সহজ কিছু না। ধর্মান্ধতার আগুনে বিভিন্ন দেশে আদতে ধর্মটির উন্নয়ন চেয়েছিলেন সেসব কর্মী, লেখক, প্রকাশক তাঁরাই খুন হয়েছেন। এমনকি উদারনীতির এই মসজিদ খোলার আগেই সেইরান ফতোয়া পেয়েছেন মিশর থেকে। কিন্তু তিনি থেমে জাননি। তিনি জানেন, প্রকৃত ইসলাম দিনকে দিন ধর্মের চে’ একটি কাল্ট হিসেবেই পৃথিবীতে টিকে থাকবে।

বার্লিনের এই উদারনীতি মসজিদ নতুন কোন কিছু নয়। কানাডা এবং আমেরিকাতেও আছে এই মসজিদ। আমি স্বপ্ন দেখি বাইতুল মুকাররম থেকে কাবা শরীফ একদিন মসজিদ বলতে বোঝাবে এমনই এক উপসনালয়। যেখানে নামাজ পড়াতে লাগবেনা লিঙ্গের পরিচয়, যৌণতার বেড়াজালে বাঁধা হবে নেতৃত্বকে। সেদিন হয়তো ঠাট্টা করে না বা মিথ্যের আশ্রয় নিয়ে না, সত্যি সত্যিই বলা যাবে – ইসলাম শান্তির ধর্ম।

Share.

About Author

অর্ণব গোস্বামী। বাংলাদেশী ব্লগার এবং প্রাক্তন সাংবাদিক। অনলাইনে লেখালেখির বয়স বছর আটেক। ইচ্ছা ছিলো, সমাজটাকে বদলে দেবার। মৌলবাদী গোষ্ঠীর রক্তচক্ষু, হুমকি-ধামকি আর সময়ে সময়ে আক্রমন দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে কিন্তু উদ্দেশ্য থেকে টলাতে পারেনি।

এখনো স্বপ্ন দেখি, বর্তমান বাংলাস্তান আবারো একদিন পরিণত হবে সোনার বাংলায়।

Leave A Reply

© Copyright 2017 | crafted by codesmite